মেরিনড্রাইভ সড়কের হিমছড়িতে গাড়ি পার্কিংয়ের নামে সড়কে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। স্থানিয় সাবেক ইউপি মেম্বার কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৬/৭ জন যুবক পার্কিংয়ের নামে পুরো এলাকা ও সড়ক থেকে টাকা উত্তোলন করছে। একারণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে পর্যটক ও গাড়ী চালকরা। টাকা উত্তোলনকারীদের সাথে গাড়ী চালক ও পর্যটকদের সাথে বাকবিতন্ডা ও অপ্রীতিকর ঘটনা নিত্য দিনের।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, মেরিনড্রাইভ সড়কের এক পাশে সমুদ্র অন্যপাশে পাহাড়। পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যদিয়ে অবস্থিত মেরিনড্রাইভ সড়কের উভয় পাশের সৌন্দর্য্য অবলোকনে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। এসড়ক দিয়ে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার মানুষের চলাচলও। মেরিনড্রাইভ সড়কের হিমছড়িতে সড়কেই চলছে চাঁদাবাজি। সড়বে বা সড়কের পাশে গাড়ি থামলেই টোকেন ধরিয়ে দিয়ে নিচ্ছে চাঁদা। ইজিবাইক থেকে শুরু করে যে কোন গাড়ী থেকে নেয়া হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা। এমন অভিযোগ বেশ কিছুদিনের।
হিমছড়ি পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, হিমছড়ি সড়কের উভয় পাশে ৫/৬ জন যুবক হাতে টোকেনের বান্ডিল নিয়ে বিভিন্ন গাড়ীর পাশে গিয়ে টাকা আদায় করছে। কোন গাড়ী দাড় করালেই টোকেন নিয়ে হাজির হয়ে টাকা আদায় করছে। রেস্তোরায় খেতে আসা কয়েকজন পর্যটক থেকেও টোকেন দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। একইভাবে সড়কের পশ্চিম পাশে এক পর্যটক গাড়ি রেখে একটি পানির বোতল ক্রয় করেন। এক যুবক এসে ৫০ টাকার একটি টোকেন দিয়ে ওই পর্যটকের কাছে টাকা দাবী করেন। দিতে না চাইলেও অনেকটা জোর করে টাকা আদায় করেন রহমত উল্লাহ নামে এক যুবক। রহমত উল্লাহ সাবেক মেম্বার কামাল হেসেনের ছোট ভাই। তার কাছে জানতে চাইলে গাড়ী দাড়ালেই পার্কিয়ের টাকা দিতে হয় বলে জানিয়ে তিনি সটকে পড়েন।
রহমত উল্লাহ ছাড়াও একইভাবে টোকেন দিয়ে টাকা আদায় করছেন আবুল কালাম, মো: ফয়সাল, মো: হারুন সহ ৬/৭ জন। তারা জানান, স্থানিয় সাবেক মেম্বার কামাল হেসেনের মাধ্যমে তারা পার্কিংয়ের টাকা আদায় করছেন। তারা প্রতিদিন টোকেন দিয়ে পার্কিয়ের টাকা উত্তোলন করে সাবেক মেম্বার কামাল হেসেনের কাছে দৈনিক বেতন পান। নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের বাইরে সড়কে ও সড়কের পাশে টাকা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়েই অন্যত্র সরে পড়েন তারা।
হিমছড়ি এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটক ও গাড়ির চালকরা প্রতিনিয়ত জিম্মি থাকে তাদের হাতে। অভিযোগ আছে টাকা দিতে না চাইলে কখনো হাতাহাতি আবার এমনকি পর্যটক সহ গাড়ির চালকেরা মারধরের শিকার হন তাদের হাতে। এ অনিয়ম বন্ধ করা না হলে মেরিনড্রাইভ সড়ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে পর্যটকরা।
পর্যটকরা জানান, মেরিনড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি ছাড়াও পাটুয়ারটেক ও ইনানীতে রাস্তার পাশেই গাড়ি রাখলেই দিতে হচ্ছে টাকা। টোকেন ধরিয়ে দিয়ে কেন টাকা নিচ্ছেন তার জবাব না দিয়ে উল্টো হুমকি ধমকি দেন। এতে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে। এটি পর্যটন খাতের জন্য খুবই নেতিবাচক।
গাড়ির চালকরা জানান, হিমছড়ি পয়েন্টে সড়কের উপর চাঁদা না দিলে তাদের গাড়িতে হামলা সহ তাদের গাড়ির চাবি রেখে দেন। এমনকি নাজেহাল করে জোরপুর্বক টাকা আদায় করেন। পার্কিংয়ের নামে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন গাড়ী চালকরা।
সী-ফুড রেস্টুরেন্টের মালিক বাবুল আলম জানান, সড়কের পাশে রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ী দাড় করিয়ে পর্যটকরা খেতে আসলেও টোকেন দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। পর্যটকদের সেবার বদলে পার্কিয়ের নামে উল্টো হয়রানি করা হচ্ছে। পর্যটকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে।
হিমছড়ি বাজার দোকান মালিক সমিতির সহ সাধারণ সম্পাদক ও রেস্টুরেন্ট ব্যাবসায়ী মোঃ রশিদ জানান, হিমছড়ি পয়েন্টের রাস্তার পাশে পর্যটকরা এক কাপ ১০ টাকা দামের চা খেতে গাড়ী দাড় করালেই এদের দিতে হয় ৫০ টাকা। রেস্টুরেন্টে ঢুকলে ত হিসাবটা আরো বেশী। এটা প্রতিদিনের ঘটনা। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেয়া দরকার।
হিমছড়ি বাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান জানান, গাড়ী পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিং ফি নিলে ঠিক আছে। কিন্তু পার্কিংয়ের বাইরে সড়কের উপর পার্কিয়ের টাকা আদায় করাটা যৌক্তিক হতে পারেনা।
হিমছড়ি বাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি শফি আলম জানান, হিমছড়িতে সড়কে বা সড়কের পাশে যে কোন গাড়ী দাড় করালেই টাকা দিতে হচ্ছে। এটা কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম সোহেল বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্দিস্ট স্থান ছাড়া প্রধান সড়কে টোকেন দিয়ে টাকা উত্তোলন করা অবৈধ। তিনি অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন ভুমি অফিসের লোক দিয়ে নির্দিষ্ট স্থান খেকে পার্কিং ফি আদায় করার নিয়ম থাকলেও সাবেক মেম্বার কামাল হোসেন ৬/৭ জন যুবক দিয়ে টাকা উত্তোলন করে আসছে। কোন গাড়ী থেকে কত টাকা পার্কিং ফি নেবে তার কোন মূল্য তালিকাও নেই। তাদের ইচ্ছেমত টাকা আদায় করছে। স্থানিয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের হয়রানির অভিযোগ প্রতিদিনের। এ বিষয়ে প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাবেক মেম্বার কামাল হোসেনের দাবী, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। খুনিয়াপালং ইউনিয়নের তহশিলদার আবছার কামাল নিজের লোক দিয়ে টাকা উত্তোলন করছেন বলেই তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
খুনিয়াপালং ইউনিয়নের তহশিলদার আবছার কামাল জানান, “রামু উপজেলার বিদায়ী ইউএনও প্রণয় চাকমা গাড়ী পর্কিং ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশানের ব্যবস্থা করেন। এ সময় থেকে সাবেক মেম্বার কামাল হোসেনকে খাস কালেকশানের টাকা আদায়ের দ্বায়িত্ব দেন। তিনি প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে আমার মাধ্যমে সরকারীভাবে জমা দেন। সপ্তাহে এক দুই দিন আমি দেখতেও যাই। তবে পার্কিয়ের বাইরে সড়কের উপর থেকে এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে বারন করা হবে।
উপজেলা প্রশাসনের পার্কিংয়ের নির্দিস্ট জায়গা ছাড়া রাস্তা থেকে টাকা উত্তোলন করা কতটুকু বৈধ সেটি জানতে
চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা মুস্তফা জানান, কে বা কারা এটা করছে সে বিষয়ে তদন্ত করা হবে। তদন্তে প্রমান পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে।
জানা গেছে, গেলো বছর ২৫ লক্ষ টাকা দিয়ে হিমছড়ি ঝর্ণার পাশের গাড়ী পার্কিং এর ইজারা দেয়া হলেও নানা কারনে তা বাদ দিয়ে খাস কালেকশন করা হয়। রামু উপজেলার বিদায়ী ইউএনও প্রণয় চাকমার সময় খাস কালেকশানের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা উঠে এই জায়গা থেকে। তবে নিয়ম না থাকলেও খাস কালেকশনের নামে পর্যটক হয়রানি কেনো? আরেকটি সুত্র বলছে, খাস কালেকশন সরকারি কর্মচারি করার নিয়ম থাকলেও করছে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। অন্যদিকে প্রতি মাসে তিন লাখ টাকার অধিক আয় হলেও তার কত শতাংশ সরকারি কোষাগারে যায়? এমন প্রশ্ন সচেতন মহলের।
ভয়েস/আআ